হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে বর্ষা মৌসুমেও বন্যপ্রাণীর পানির সংকট দেখা দিয়েছে। নাম সাতছড়ি হলেও বনের ভেতরের সাতটি পাহাড়ি ছড়ায় দীর্ঘসময় পানি জমে থাকে না। ছড়াগুলো অত্যন্ত ঢালু হওয়ায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নিচের দিকে নেমে যায়। ফলে ভারী বৃষ্টির মধ্যেও পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা না থাকায় বনের বিভিন্ন অংশে পানির সংকট তৈরি হচ্ছে।
বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বন্যপ্রাণীর পানির চাহিদা মেটাতে বন বিভাগের উদ্যোগে বনের ভেতরে কয়েকটি কৃত্রিম জলাধার ও পুকুর তৈরি করা হয়েছিল। এর মধ্যে তিনটি পুকুর অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুকুরগুলোর পাড় ভেঙে পানি বেরিয়ে গেছে। পাশাপাশি পলি জমে কমেছে পানির ধারণক্ষমতা। এতে বন্যপ্রাণীর জন্য পানির উৎস আরও সীমিত হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সাতছড়ির বন্যপ্রাণীর পানির সংকট নতুন নয়। শুষ্ক মৌসুমে এ সংকট আরও তীব্র হয়। তবে এবার বর্ষা মৌসুমেও ছড়াগুলোতে পানি ধরে না থাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বনজুড়ে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় বানর, হনুমানসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী পানির সন্ধানে বন থেকে বেরিয়ে আশপাশের চা-বাগান ও লোকালয়ের দিকে চলে আসছে।
বন এলাকার বাসিন্দা নিজামুল হক বলেন, সম্প্রতি বনের আশপাশে বিভিন্ন ধরনের বন্যপ্রাণীর চলাচল বেড়েছে। বিশেষ করে বানর ও হনুমানকে লোকালয়ের কাছাকাছি দেখা যাচ্ছে। পানির পাশাপাশি খাবারের সন্ধানেও তারা বন থেকে বেরিয়ে আসছে। এতে প্রাণীদের নিরাপত্তা যেমন ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে, তেমনি মানুষও আতঙ্কে থাকছেন।
স্থানীয় ত্রিপুরা পল্লীর হেডম্যান চিত্ররঞ্জন দেববর্মা বলেন, বন্যপ্রাণীর পানির জন্য তৈরি তিনটি পুকুরের দুটিই পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাতছড়ির ছড়াগুলো দেখতে পানিতে ভরা মনে হলেও অতিরিক্ত ঢালু হওয়ায় পানি দ্রুত চলে যায়। ফলে বৃষ্টির মধ্যেও বনের বিভিন্ন অংশে পানির সংকট থাকে। দ্রুত পুকুরগুলো সংস্কার এবং আরও জলাধার তৈরি করা না হলে শুকনো মৌসুমে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে।
২৪৩ হেক্টর আয়তনের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। এ বনে প্রায় ২৪ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৪৯ প্রজাতির পাখি এবং শতাধিক প্রজাতির সরীসৃপ ও উভচর প্রাণীর দেখা মেলে। উল্লুক, চশমাপরা হনুমান, মেছোবিড়াল, মায়াহরিণ ও লজ্জাবতী বানরের মতো বিরল প্রাণীরও আবাসস্থল এ বন।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)-এর মাঠ সমন্বয়ক ওমাইয়া ফেরদৌস বলেন, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলে খাবার ও পানির স্বাভাবিক উৎস নষ্ট হলে প্রাণীরা বিকল্প উৎসের সন্ধানে বন থেকে বেরিয়ে পড়ে। এতে মানুষের সঙ্গে সংঘাতের পাশাপাশি প্রাণীদের প্রজনন ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও ব্যাহত হয়। সাতছড়ির ক্ষেত্রে শুধু পুকুর সংস্কার নয়, ছড়ার পানি ধরে রাখার উপযোগী ছোট ছোট জলাধার ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, পানির সংকটে অনেক বন্যপ্রাণী মারা গেলেও এসব মৃত্যুর খবর অনেক সময় নজরে আসে না। বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিত করতে বনের ভেতরে স্থায়ী ও নিরাপদ পানির উৎস তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে অতীতে বন্যপ্রাণীর খাবারের জন্য যে ফলের বাগান করা হয়েছে, সেগুলোরও যথাযথ পরিচর্যা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা দরকার।
সাতছড়ি বন্যপ্রাণী প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের মৌলভীবাজার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবুল কালাম বলেন, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে পুকুর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। বন্যপ্রাণীর পানির সংকট এড়াতে দ্রুত পুকুর খনন, পাড় পুনর্নির্মাণ এবং বিকল্প পানির উৎস তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে। বনের প্রাণী, প্রকৃতি ও পরিবেশকে আরও সমৃদ্ধ করাই বন বিভাগের লক্ষ্য।

